Back

সম্পাদকীয়

শতবর্ষের আলোকে তারকেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়

সালটা ১৯২৫ ‘আজি হতে শতবর্ষ’ পূর্বে তারকেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়, যা একদা তারকনাথ বিদ্যালয় এবং কিছু পরে “তারকেশ্বর হাই ইংলিশ স্কুল” নামে বাবা তারকনাথের অংশ হিসাবে, তারকেশ্বর এস্টেটের রিসিভার শ্রী অমূল্য চন্দ্র ভাদুড়ী মহাশয়-এর দূরদর্শিতা ও বিদগ্ধতার প্রতিরূপ আকারে আত্মপ্রকাশ করে। শৈবতীর্থ তারকেশ্বরে বহু ভাষা-ভাষী মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো উদ্ভাসনের সদিচ্ছায় সকল প্রতিবন্ধকতা সামলে হেলায় অতিক্রম করে শতবর্ষের মাইলস্টোন।

তাংঃ ২রা জানুয়ারী, সন : ২০২৫

১০১ বছরে পদার্পনকারী তারকেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয় আজ সগর্বে মূখ ঘুরিয়ে দেখে দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য ছাত্রছাত্রী যার ধবল-ধ্বজা উড্ডীয়মান; শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান গবেষনা ও সর্বক্ষেত্রে। এই স্বর্ণভূমিতে আমার পা পড়েছিল ২০০২ সালে এবং স্বর্ণরূপ ছাত্র আহরনের তীব্র ইচ্ছা আমাকে বন্দী করল এ স্কুলে। ক্লাসে পড়ানোর সময় মনোমুগ্ধ, আবিষ্ট কচি-কাঁচা মুখগুলো আমার অন্তরে পড়ানোর নেশার মতো ঘোর তৈরি করত। এভাবে কেটে গেল কয়েক দশক ।

সালটা ২০১৭-র শেষদিক। প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে বিদ্যালয়কে সুসংহত করবার দায়িত্ব নিয়ে শুরু হল এক অন্য যাত্রাপথ। শয়নে-স্বপনে-জাগরনে-ভাবনায় জড়িয়ে গেল স্কুলের ভালো এবং মন্দের আখ্যান । শুরু হল একটার পর একটা ভাবনার ফুল দিয়ে তারকেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়-এর রঙীন মালা গাঁথার কাজ । সবুজ বাগানযুক্ত আশ্রমিক ক্যাম্পাস, শিল্পীর তুলিতে রঙীন দেওয়াল, পুরানো ভবনের ছাদ ও একাধিক ঘর সংস্কার, নতুন চারটি ঘর নির্মান, গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ করা, সেন্ট্রাল এ্যাড্রেস সিস্টেম, সাব-মার্সিবল, ঠান্ডা জলের মেশিন, একাধিক অ্যাকোয়াগার্ড মারফত পরিশুদ্ধ পানীয় জলের সু-বন্দোবস্ত, ৩২টি CCTV-র অখন্ড প্রহরা, মাল্টিজিম ও সোলার প্যানেল স্থাপন, ইলেকট্রিক লাইনের সংস্কার, বিভিন্ন ল্যাব-গ্রান্ট নিয়ে আসা ও উন্নত ল্যাব স্থাপন করা, কর্মপোযোগী ভোকেশনাল কোর্স যথা Electronics এবং Plumbing চালু করা, কম্পিউটার শিখনের জন্য ICT অনুমোদন লাভ করা সহ বিবিধ।

আজ স্টাফ-রুম স্বয়ং সম্পূর্ন – শূন্যপদ নেই বললেই চলে। বিগত ৫ বছরে ২১ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এ বিদ্যালয়ে অ্যাপ্রুভাল পেয়েছেন এবং উচ্চ বিদ্যালয় পরিবারের সদস্য হিসাবে শিক্ষাদানে ব্রতী হয়েছেন। ফলস্বরূপ বিজ্ঞান মেলায় রাজ্য সেরা ও মেধাতালিকায় বারবার স্থান করে নেয় এ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা (উল্লেখ্য ২০১৯ সালে ও ২০২২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় দশম স্থান অর্জন)। এছাড়া বিভিন্ন খেলায় রাজ্যস্তরে ও জাতীয়স্তরে উল্লেখযোগ্য প্রদর্শন আছে এই বিদ্যালয়ের ছাত্রদের। বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রশস্ত মাঠ খেলোয়াড় তৈরীর আতুড়ঘর। আজ ছাত্র-শূন্যতার রক্তাল্পতায় ভোগা অধিকাংশ বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়-এর মধ্যে প্রায় ২০০০ শিক্ষার্থী সমন্বিত তারকেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয় অভিভাবক-অভিভাবিকাদের আস্থা ও ভরসার প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভিড় করেছে এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। আপন করে নিয়েছে এই বিদ্যালয়কে। শিক্ষার্থীর হলিস্টিক ডেভলপমেন্ট সহজেই চোখে পড়ে ল্যাবে, লাইব্রেরিতে, পিয়ার লার্নিং, স্বাধীনতা দিবস বা শিক্ষক দিবস উদ্যাপনে। ভালো বা আরো ভালো কিছু করবার কন্টকাকীর্ণ পথে ফুল বিছিয়ে দিয়েছিলেন যেইসব মহামতী মানুষগুলো – তা তিনি শিক্ষক হোন, অভিভাবক হোন, পরিচালন সমিতির সদস্য বা শুভানুধ্যায়ী প্রাক্তনী, আজ শতবর্ষের মহিমামান্বিত তারকেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে তাদের কথা বড় বেশী করে মনে পড়ছে। মনে পড়ছে লিও টলস্টয়ের লেখা ‘থ্রি কোয়েশ্চান’-এর রাজার প্রশ্নের উত্তরে সর্ব্বজ্ঞানী সাধুর সেই অমোঘ উক্তি “Present time is the most important time”। আর আজকের সুন্দর বর্তমানই তো পরম সত্য; শিবসুন্দর। এই মাহেন্দ্রক্ষনে আয়োজিত হতে চলেছে তারকেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয় শতবর্ষ পূর্তি উৎসব।

তাংঃ ২রা জানুয়ারী সন : ২০২৫

সমগ্র বিদ্যালয় আজ আলোকমালায় সজ্জিত। মাঠ জুড়ে শামিয়ানা, অত্যাধুনিক আলোকসজ্জায় মোড়া মায়াবী মঞ্চ, হৃদয়স্পর্শী শব্দ-সুরে চারিপাশ উৎসবমুখর। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় পা মেলালেন আট থেকে আশী – প্রাক্তনী থেকে বর্তমান। শীতের নরম আলো গায়ে মেখে উচ্চ বিদ্যালয় ময়দান থেকে শুরু হল সুশৃঙ্খল শোভাযাত্রা। প্রায় ২কিমি পথ মধ্যে রাস্তার দুপাশে দাঁড়ানো মানুষজনের হাতে তুলে দেওয়া হলো পরিবেশরক্ষার অঙ্গীকারপত্র – একটা আমগাছের চারা। ঢাকের শব্দে, ভাষ্যপাঠ ও ছোট মনীষীদের উপস্থিতিতে, নাচ গানে ছন্দে মাতোয়ারা হল তারকেশ্বরবাসী। সুসজ্জিত ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নজর কাড়ে সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একই রঙের পোশাক। বেলা ১২টায় মঞ্চে উপস্থিত মন্ত্রী মহোদয়গন, স্থানীয় বিধায়ক-বিধায়িকা ও শিক্ষাদপ্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করলেন তারকেশ্বর মঠের মঠাধীশ শ্রী শ্রীমদ্ দন্ডিস্বামী সুরেশ্বরাশ্রম মহারাজ। বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী তথা তারকেশ্বর বিধানসভা ক্ষেত্রের বিধায়ক শ্রী রামেন্দু সিংহরায় মহাশয়-এর সৌজন্যে নির্মিত মনীষী সকল যথা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও নজরুল ইসলামের আবক্ষ মর্মর মূর্তির উদ্বোধন হলো। অশক্ত অসুস্থ শরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীন শিক্ষকমহাশয় সকল। কারোর চোখে জল, কেউ বা আবেগে জড়িয়ে ধরছেন অপরকে। নিজেদের স্কুলবেলার প্রিয় শিক্ষকদের পেয়ে আত্মহারা প্রাক্তনীরাও। নানা রঙ-বেরঙের অনুষ্ঠানের ডালি সাজিয়ে তুলেছিল এই চারদিন ব্যপী মহামঞ্চকে। কাছে-দূরে থাকা সকল প্রাক্তনীর আগ্রহ ও শুভেচ্ছা এবং নিরলস পরিশ্রম ও আবেগ এই অনুষ্ঠানের USP.

তাই সূচী মেনে নয়, অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিল আবেগের। সন্ধ্যে ৭টায় সমাপ্তির নির্দ্দিষ্টতাকে ম্লান করে আবেগের, উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে দীর্ঘসময় ধরে তা যেন সপ্তমসুরে পৌঁছে যায়। তবুও দিনগুলো সেই কবি Keats -এর কথায় “Passed like an angel’s tear”। ৫ তারিখ রাত্রী ১০.১৫ টায় যখন আনুষ্ঠানিকভাবে শতবর্ষপূর্তি উদ্যাপন উৎসবের সমাপ্তি ঘোষিত হচ্ছে, মঞ্চের বামদিক থেকে কে যেন বলে উঠল “শেষ নয়, শুরু হল”। সত্যিই তো! এক চিরন্তন কালজয়ী বন্ধনের শুরু। ছাত্র-শিক্ষক-প্রাক্তনী এবং বিদ্যালয়ের অভেদ্য চতুর্ভূজ যা ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে . . .’ এই একই প্রাঙ্গনে একই মঞ্চ তৈরী করে আগামীর জয়গান – বিদ্যালয়ের জয়গান গাইবে। মহাভারতের সঞ্জয়ের মতো আমিও মনশ্চক্রে সেই মহাভারত স্পষ্টতই দেখতে পারছি। এই অমরকথার একজন চরিত্র হিসাবে আমি যারপরনাই গর্বিত, অভিভূত। পরম করুনাময় ঈশ্বর আজ আমার হাতে এই অনুষ্ঠানকে LEAD করবার ভার সপেঁছেন। এই LEAD বা LEADER এর গ্রাহ্য, গভীর এক সংজ্ঞা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করি – “A good leader is one whose presence is felt… A better leader is one whose absence is felt, but the best leader… neither his presence, not his absence is felt.”

সম্পাদকীয় অন্তে, মঙ্গলের কল্পবৃক্ষ স্বরূপ বাবা তারকনাথের পাদপদ্মে ‘প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্ ’বলে আমার প্রনাম জানাই। বন্দেপিতরম্ তারকেশ্বরম্।।

– শ্রী সঞ্জয় মজুমদার (প্রধান শিক্ষক, তারকেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়)

Archana Magazine: Special Centenary Issue